রূপকথার গল্প




ছোটগল্প

______________

রূপকথা

______________

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়


অমরেশ স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে এসে চুঁচুড়া স্টেশনের আপ প্লাটফর্মএ উঠেই বাসব দেখতে পেলো সুমনা ডাউন প্লাট ফর্মের বুকিং অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে এইচ আই টি কলেজের একটি ছেলের সঙ্গে গল্প করছে. এপার থেকে বাসবের হাত নাড়া দেখেও সুমনা যেন দেখতে পায় নি এমন একটা ভান করলো. ইদানীং সুমনাকে প্রায়ই ঐ ছেলেটির সঙ্গে দেখা যায়. বাসব একদিন জিজ্ঞাসা করে ছিল ঐ ছেলেটির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?

সুমনা একটু বিরক্ত হয়ে জবাব দিয়ে ছিল -একজন ভালো বন্ধু.

বাসব নিজের অস্তিত্ব খোঁজার জন্য সুমনার কাছে জানতে চেয়েছিল, তাহলে তার জীবনে বাসবের অবস্থানটাএখন ঠিক কোথায়? হৃদয়ে না বাইরে?

সুমনা অক্লেশে বলে দিয়ে ছিল, যা বোঝার বুঝে নিও.

আজও সুমনাকে অনেকটা বেপরোয়া মনে হলো. বাসব ধৈর্য হারিয়ে সুমনার কাছে গিয়ে বললো, তোমার একটু সময় হবে? আমার কিছু কথা ছিল.

সুমনা জানালো, তোমার তো ট্রেনের সময় হয়ে গেছে, বাড়ি চলে যাও.

বাসব উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, আমি পরের ট্রেনে যাবো.

সুমনা !এভাবে আর কতদিন চলতে পারে?

দুনৌকায় পা দিয়ে নদী পার হওয়া যায় না. আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্ককে এভাবে তুমি অস্বীকার করতে পারো না.

সুমনা বললো, তুমি এখন আসতে পারো.

নতুন বন্ধুটি দুপা এগিয়ে এসে জানালো,

‘আমরা অনেক দিন থেকেই এনগেজড.

আপনি ভুল নৌকায় পা দিয়ে ছিলেন.

আমাদের বিরক্ত করবেন না.’

কিন্তু এই কবছরে আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছে সবটাই —-

বাসব কথাটা শেষ করতে পারলো না. সুমনা উত্তেজিত হয়ে জানালো –

সব কিন্তুর কোন জবাব হয় না.

কথাটা শুনে বাসব নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলো না. এই সেই সুমনা?

বাসব ধীরে ধীরে ওভার ব্রিজের সিঁড়ি ভেঙে এপারে চলে এলো.

দুচোখের দৃষ্টি ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে এলো. প্লাটফর্ম ভর্তি লোক সব দেখেছে মনে হয়.

বাসবের মনে পড়ে যেতে লাগলো- পাঁচবছরের অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা. অনেক প্রতিশ্রুতির কথা—-

ডাউন প্লাটফর্মে একটা ব্যান্ডেল লোকাল এসে দাঁড়ালো. ট্রেনটি ছেড়ে যেতেই বাসব দেখলো, সুমনারা আর নেই. চলে গেছে.

কয়েক পা এগোতেই বাসব দেখলো, সুমনারই এক সহপাঠী বন্ধু পারমিতা দাঁড়িয়ে আছে. বাসবকে চেনে ফার্স্ট ইয়ার থেকেই. বাসবও চেনে তাকে. বৈঞ্চিগ্রামে বাড়ি.

-একটা কথা বলবো তোমাকে?

বলো.

ইতি মধ্যে ট্রেন এসে গেলো. চলো গাড়িতে ওঠো. পারমিতা শুরু করলো –

-আমি সব দেখেছি. তোমাদের সম্পর্কটা এখন ভেঙে গেছে. তুমি সুমনাকে ভুলে যেও. একদিন সুমনার মুখে তোমার অনেক প্রশংসা শুনেছি. তুমি ভালো কবিতা লেখো.

গান গাইতে পারো. পিন্টু ভট্টাচাৰ্য তোমার প্রিয় শিল্পী. তোমাকে নিয়ে ক্লাসেও আমাদের আলোচনা হয়.

সুমনাএখন অনেক বদলে গেছে. থার্ড ইয়ারে উঠে আমরাও এই পরিবর্তন লক্ষ করেছি.

কেউই সাপোর্ট করে নি.

কিন্তু ওর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া চিঠি গুলো কী করবো?

-পুড়িয়ে ফেলো.

কিন্তু পারমিতা, আজ সব যেন রূপকথা মনে হচ্ছে. সেই দশম শ্রেণী থেকে আমাদের সম্পর্ক…..

-তোমার স্টেশন এসে গেলো. জীবনের প্রথম প্রেম কারও টেঁকে না. খেলাঘর হয়ে যায়. অনেকটা পদ্ম পাতায় জলের মতো.

তোমার আঘাত যেখানে লেগেছে সেখানে কারও হাত পৌঁছাবে না. পারমিতা আরও বললো –

-আজ থেকে তোমার জীবনে সুমনা অতীত. যা দেখলে সেটাই বর্তমান. ভালো করে পড়াশোনা করো. তোমার চোখের জলের হিসেব সুমনাকে একদিন দিতেই হবে….


ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাসব স্টেশনে নেমে পারমিতাকে কী বলবে ঠিক ভেবে পেলো না. ডান হাতটা একবার তুললো কিছু বলার জন্য.

কিন্তু মুখে কোন ভাষা এলো না.শুধু চোখের জলে তার চলার পথটা ভিজে গেলো. 

Post a Comment

0 Comments